বিসিএস পরীক্ষায় কোন কোন বিষয় থেকে প্রশ্ন আসে? প্রিলি, লিখিত ও ভাইভা

Mostafizur Rahman
Mostafizur Rahman

Mostafizur Rahman is a Bangladesh-based content writer and founder of Porikrama. He writes practical, reader-focused content on education, jobs, citizen services, travel, agriculture, technology and general lifestyle information. He focuses on accuracy, clarity, and creating useful content for Bangladeshi readers.

বাংলাদেশের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় ও সম্মানজনক ক্যাডার সার্ভিসে যোগদানের মাধ্যম হলো বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষা।

প্রতি বছর লাখ লাখ পরীক্ষার্থী এই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা ও সিলেবাসের স্পষ্ট ধারণা না থাকার কারণে অনেকেই মাঝপথে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন।

আপনি যদি বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবে শুরুতেই জানা প্রয়োজন- বিসিএস পরীক্ষায় কোন কোন বিষয় থেকে প্রশ্ন আসে, এর জন্য কী কী যোগ্যতা লাগে এবং কীভাবে একটি নিখুঁত প্রস্তুতি শুরু করা যায়।

এই ব্লগে আমি বিসিএস পরীক্ষার বিস্তারিত সিলেবাস ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলির সহজ উত্তর আলোচনা করব।

বিসিএস পরীক্ষার প্রিলিমিনারি সিলেবাস: কোন কোন বিষয় থেকে প্রশ্ন আসে?

বিসিএস পরীক্ষার প্রথম ধাপ হলো ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি (MCQ) পরীক্ষা। মোট সময় থাকে ২ ঘণ্টা। এতে ১০টি নির্দিষ্ট বিষয় থেকে প্রশ্ন তৈরি করা হয়।

বিষয়ভিত্তিক নম্বর বণ্টন নিচে দেওয়া হলো:

বিষয়নির্ধারিত নম্বর
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য৩৫
ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য (English Language & Literature)৩৫
বাংলাদেশ বিষয়াবলি৩০
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি২০
ভূগোল (বাংলাদেশ ও বিশ্ব), পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা১০
সাধারণ বিজ্ঞান১৫
কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি১৫
গাণিতিক যুক্তি (Mathematics)১৫
মানসিক দক্ষতা (Mental Ability)১৫
নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন১০
মোট২০০

বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন বিশ্লেষণের ধরণ:

  • বাংলা: ব্যাকরণ অংশ (১৫ নম্বর) থেকে প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, বানান, সমাস, কারক ও সন্ধি ইত্যাদি আসে। সাহিত্য অংশ (২০ নম্বর) থেকে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্টি থেকে প্রশ্ন হয়।
  • ইংরেজি: Grammar (২০ নম্বর) অংশের জন্য Parts of Speech, Idioms, Correction এবং Vocabulary গুরুত্বপূর্ণ। Literature (১৫ নম্বর) অংশে Elizabethan age থেকে Modern age পর্যন্ত বিখ্যাত লেখকদের কর্ম নিয়ে প্রশ্ন আসে।
  • বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি: বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, অর্থনীতি ও সাম্প্রতিক অর্জন থেকে বড় অংশ আসে। আন্তর্জাতিক অংশে আন্তর্জাতিক সংগঠন, চুক্তি ও ভৌগোলিক রাজনীতি প্রাধান্য পায়।
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: দৈনন্দিন জীবনের বিজ্ঞান, পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান এবং কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, হার্ডওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি থেকে প্রশ্ন আসে।
  • গণিত ও মানসিক দক্ষতা: বীজগণিত, পাটিগণিত, জ্যামিতির মৌলিক ধারণা এবং চিন্তাশক্তি ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাই করা হয়।

বিসিএস লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার ধরণ

প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ৯০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা এবং ২০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) দিতে হয়।

লিখিত পরীক্ষার বিষয়াবলি:

  • সাধারণ ক্যাডার: বাংলা (২০০), ইংরেজি (২০০), বাংলাদেশ বিষয়াবলি (২০০), আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি (১০০), গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা (১০০), এবং সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (১০০)। মোট = ৯০০ নম্বর।
  • টেকনিক্যাল/প্রফেশনাল ক্যাডার: সাধারণ বিজ্ঞানের বদলে সংশ্লিষ্ট পদ বা বিষয়ের ওপর ২০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হয়।

লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ২০০ নম্বরের ভাইভায় অংশগ্রহণ করতে হয়, যেখানে সর্বনিম্ন ৫০% নম্বর বা ১০০ নম্বর না পেলে পাস করা যায় না।

বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার নূন্যতম ও শিক্ষাগত যোগ্যতা

বিসিএস পরীক্ষায় আবেদন করার আগে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে আপনি সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী যোগ্য কি না।

বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা:

  • পাস বা ডিগ্রি: যেকোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছর মেয়াদি স্নাতক (Honours) বা সমমানের ডিগ্রি থাকতে হবে।
  • ন্যূনতম যোগ্যতা: শিক্ষাজীবনে একটির বেশি ‘তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণি’ (3rd Class/Division) বা সমমানের CGPA থাকা যাবে না।
  • অ্যাপিয়ার্ড (Appeared) ক্যান্ডিডেট: যদি কোনো প্রার্থীর স্নাতকের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হয়ে থাকে এবং ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে, তাহলেও তিনি বিসিএস পরীক্ষার জন্য আবেদন করতে পারবেন (তবে নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে)।

বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার অন্যান্য যোগ্যতা:

  • বয়সসীমা: সাধারণ প্রার্থীদের জন্য বয়স ২১ থেকে ৩০ বছর হতে হবে। তবে মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, প্রতিবন্ধী প্রার্থী এবং স্বাস্থ্য ক্যাডারের জন্য বয়সসীমা ৩২ বছর পর্যন্ত শিথিলযোগ্য।
  • নাগরিকত্ব: প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।

বিসিএস পরীক্ষার শারীরিক যোগ্যতা কি?

ক্যাডারভেদে শারীরিক যোগ্যতার কিছুটা তারতম্য দেখা যায়। বিশেষ করে পুলিশ (Police) ও আনসার (Ansar) ক্যাডারের জন্য নির্দিষ্ট শারীরিক মাপকাঠি অনুসরণ করা বাধ্যবাধকতা।

সাধারণ ও পুলিশ ক্যাডারের জন্য ন্যূনতম শারীরিক যোগ্যতা:

  • উচ্চতা:
    • পুরুষ প্রার্থী: সাধারণ ক্যাডারের জন্য ৫ ফুট ২ ইঞ্চি (তবে পুলিশ ও আনসার ক্যাডারের জন্য সর্বনিম্ন ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি)।
    • নারী প্রার্থী: সাধারণ ক্যাডারের জন্য ৫ ফুট (তবে পুলিশ ও আনসার ক্যাডারের জন্য সর্বনিম্ন ৫ ফুট ২ ইঞ্চি)।
  • ওজন: উচ্চতা অনুযায়ী বয়স ও শারীরিক গঠনের সঠিক ভারসাম্য (BMI অনুযায়ী) থাকা বাঞ্ছনীয়।
  • বুকের মাপ (শুধুমাত্র পুরুষ প্রার্থীর জন্য): স্বাভাবিক অবস্থায় ৩০ ইঞ্চি এবং প্রসারিত অবস্থায় ৩২ ইঞ্চি হতে হবে (বিশেষ ক্যাডারের ক্ষেত্রে)।
  • দৃষ্টিশক্তি: দৃষ্টিশক্তি ভালো হতে হবে। চশমাসহ বা চশমা ছাড়া নির্দিষ্ট মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে।
  • মেডিকেল টেস্ট: চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মেডিকেল বোর্ডে স্বাস্থ্য পরীক্ষা উত্তীর্ণ হতে হয়।

বিসিএস পরীক্ষা কতবার দেওয়া যায়?

অনেক চাকরিপ্রার্থীর মনেই প্রশ্ন থাকে- একজন প্রার্থী জীবনে কতবার বিসিএস পরীক্ষা দিতে পারেন?

নিয়মকানুন:

বর্তমানে বাংলাদেশে বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো “বার” বা Attempt-এর সীমা নেই। একজন প্রার্থী তাঁর বয়সসীমা (২১ থেকে ৩০/৩২ বছর) থাকা পর্যন্ত যতবার ইচ্ছা বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। বয়স শেষ না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টার ওপর কোনো আইনি বাধা নেই।

(নোট: সরকার সময়ে সময়ে সরকারি চাকরির বিধিমালা সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারে, তাই প্রতিবার নতুন সার্কুলার ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত।)

বিসিএস প্রস্তুতি কিভাবে শুরু করব?

একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া বিসিএস জয় করা কঠিন।

প্রস্তুতি শুরু করার সময় নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:

ধাপ ১: বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ

সবচেয়ে প্রথম কাজ হলো ১০ম থেকে সাম্প্রতিকতম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্ন সমাধান করা। এর মাধ্যমে কোন কোন বিষয় থেকে বেশি প্রশ্ন আসে এবং প্রশ্নের প্যাটার্ন কেমন হয়, সে সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়।

ধাপ ২: সিলেবাস বিস্তারিত দেখা

পিএসসির (PSC) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার সিলেবাস ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিন। পড়ার টেবিলের সামনে রাখুন যাতে প্রতিদিন দেখে পড়া এগিয়ে নেওয়া যায়।

ধাপ ৩: বেসিক বই পড়া (৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি)

সরাসরি গাইড বই না কিনে আগে বোর্ডের মূল বইগুলো পড়ুন।

  • বাংলা: ৯মে-১০ম শ্রেণির বাংলা দ্বিতীয় পত্র (পুরোনো সংস্করণ)।
  • গণিত: ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণির গণিত বই।
  • বিজ্ঞান: ৮ম থেকে ১০ম শ্রেণির সাধারণ বিজ্ঞান ও ভূগোল বই।

ধাপ ৪: স্ট্যান্ডার্ড গাইড ও রেফারেন্স বই সংগ্রহ

বাজারের বিশ্বস্ত প্রকাশনীর বিষয়ভিত্তিক গাইড বই (যেমন: বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির জন্য) সংগ্রহ করুন।

ধাপ ৫: দৈনিক রুটিন ও রিভিশন

প্রতিদিন অন্তত ৬-৮ ঘণ্টা পড়ার একটি সুনির্দিষ্ট রুটিন বানান। নতুন পড়া পড়ার পাশাপাশি বিগত দিনের পড়া রিভিশন দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ধাপ ৬: নিয়মিত মডেল টেস্ট ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

পড়া শেষ করার পর অনলাইন বা অফলাইনে নিয়মিত মডেল টেস্ট দিন। নেগেটিভ মার্কিং এড়াতে মডেল টেস্টের বিকল্প নেই। এছাড়া সাম্প্রতিক তথ্য ও বিশ্বঘটনাবলির জন্য নিয়মিত ভালো মানের দৈনিক পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

শেষ কথা

বিসিএস পরীক্ষা কেবল একটি সাধারণ চাকরির পরীক্ষা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অধ্যবসায় ও ধৈর্যের পরীক্ষা। সঠিক সময়ে সঠিক সিলেবাস অনুযায়ী কৌশলগত প্রস্তুতি নিতে পারলে প্রথমবারেই এই পরীক্ষায় সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

আজই সিলেবাস বিশ্লেষণ করে এবং মূল বইগুলো সাথে নিয়ে আপনার বিসিএস যাত্রার প্রথম পদক্ষেপটি গ্রহণ করুন। শুভকামনা আপনার স্বপ্নের বিসিএস ক্যাডার হওয়ার এই পথচলায়!

Mostafizur Rahman
Mostafizur Rahman

Mostafizur Rahman is a Bangladesh-based content writer and founder of Porikrama. He writes practical, reader-focused content on education, jobs, citizen services, travel, agriculture, technology and general lifestyle information. He focuses on accuracy, clarity, and creating useful content for Bangladeshi readers.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top