দু’টো অণুগল্প- এস আই সানী

তুলসীমালা

তড়িঘড়ি করে মোড়ে এসে দেখি বাস এখনো আসেনি। যাক বাবা বাঁচা গেল! গাড়ি মিস করলে আমার খবর ছিল! অফিসে পৌঁছাতে দেরি তো হতোই, সাথে বসের কর্কশ কণ্ঠের মধুর(!) ঝাড়ি একদম ফ্রি! মিনিট দুই পরে বাস আসলো। ঠেলাঠেলি করে আগে উঠে দেখি, পিছন দিকে একটা সিট খালি। সেখানে যেয়ে বসতে গিয়ে থমকে গেলাম!

চিকন ভ্রুঁ জোড়ার নিচে হালকা নীল বর্ণের ডাগর দু’টি চোখ, তীক্ষ্ণ নাসিকার ডগায় মুক্তোদানার ন্যায় বিন্দুবিন্দু ঘাম, প্রসাধনির প্রলেপহীন অধর দু’টি ফুটন্ত রক্তজবা। পানপাতা আকৃতির মুখ। তবে মেয়েটার মধ্যে কোন আধুনিকতার ছোঁয়া নেই। অতি সাধারণ একটি মেয়ে বসে আছে জানালার পাশে। ওর হাত খালি, গলাও খালি, তবে নাকের উপর মুক্তদানার ন্যায় জ্বলজ্বল করছে একটি জলটোপ। পরনে অতি সাধারণ ঢিলেঢালা সালোয়ার-কামিজ। জর্জেটের একখানি ওড়নায় ঢাকা মাথা-বুক। মেয়েটি একবার আমার দিকে তাকিয়ে জানালার পাশে চেপে বসল। কিন্তু ততক্ষণে আমার মন মেয়েটিকে নিয়ে ঘুরছিলো নদীপাড়ের কোন এক কাশের বনে! কাশফুল মেখে আমি হয়েছি সাদা, আর লজ্জা মেখে মেয়েটি হয়েছে লাল। ওর খালি পায়ে পরিয়ে দিয়েছি একজোড়া কাশের নূপুর। লাজেরাঙা অধর দু’টিতে আমার ডানহাতের মধ্য আঙুলের আলতো স্পর্শ……..!

নাহ্! ভাবনাগুলো অসমাপ্ত! কন্ডাক্টরের হুঙ্কারে চেতনা ফিরে এলো আমার। বসলাম মেয়েটির পাশে।
আমি কী এক বাজে ছেলে, তাই না? সামান্য একনজরে কতো কিছুই না ভেবে ফেললাম মেয়েটিকে নিয়ে। তবে বিশ্বাস করুন, এর আগে কখনোই এমন হয়নি আমার।

প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করে মাকে কল দিলাম-
: মা, খুবই সাধারণ! যেন পল্লীগাঁয়ের দিগন্তপ্রসারী সবুজ ধানক্ষেতের অস্পর্শী ডাহুকপাখি!
মা মেয়েটির নাম-পরিচয় জেনে নিতে বললেন। আরও বললেন, মেয়েটাকে অবশ্যই নামাজী হতে হবে।
:মা, আমার তো মনে হয় ও শুধু নামাজীই না, হাদিস-কুরআনও মুখস্ত ওর।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাস এসে থামলো পরের স্টপে। মেয়েটি ওড়নার ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে দ্বিতীয় বাবের মতো আমাকে দেখলো। আহ্! চাহনি যেন নয়, বুকে চাবুক মারলো কেউ!
মোহনীয় কণ্ঠে সে বলে উঠলো- আমি নামবো, একটু সাইড দিন প্লিজ! অসাধারণ মধুর কণ্ঠস্বরে বিমোহিত হলাম আরেক পশলা। পরমুহূর্তে তিড়িং করে লাফিয়ে সিট থেকে উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু আমার অবাধ্য চোখের নজরটা মেয়েটির সমস্ত গায়ে লুটোপুটি খেলছিলো!
জানালার পাশের সিট থেকে উঠতে যাবে মেয়েটি, ঠিক সেই মুহূর্তে এক দমকা দস্যিসমীরণ এসে মেয়েটির মাথা থেকে ওড়নাটা ফেলে দিলো। নিমিষেই ‘থ’ বনে গেলাম আমি! চোখদু’টো বড়বড় আর গালটা ‘হা’ হয়ে গেল! দেখি, মেয়েটির গলায় চিকন দানার তুলসীমালা, আর সিঁথিতে তার টুকটুকে লাল সিঁদুরের রঙ!!

আমার শরীরের খুব কোল ঘেঁষে নেমে গেল মেয়েটি। ধীরপায়ে হেঁটে চলেছে সামনের দিকে। ততক্ষণে গড়াতে শুরু করেছে বাসের চাকাগুলো। কিন্তু তখনো আমার দৃষ্টি জানালার কাঁচ ভেদ করে মেয়েটির চলার পথে স্তব্ধ…..!


কৃষ্ণকলি

অনেকদিন পর কৃষ্ণকলির সাথে দেখা। পড়ন্ত বিকেল। বৈশাখী মেলা। হঠাৎ করে সামনে পড়লো। এভাবে দেখা হবে‚ ভাবিনি।
:স্যার‚ কেমন আছেন?
থমকে গিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চারপাশের হইচই-চেঁচামেচি তখন আর কানে ঢুকছে না। হয়তো অহেতুক ভাবনার সারথি হয়েছি।
ক্ষণিক বাদে-
:স্যার‚ কেমন আছেন?
থতমত খেয়ে উঠলাম খানিকটা।
:ও-হ্যাঁ! মানে!
ইতস্তত হয়ে গেলাম পুরোপুরি। সে কী বলেছে‚ আমার কানে পৌঁছেনি। দেখলাম‚ কৃষ্ণকলির মুখে স্মিত হাসি। যে হাসি নিরেট প্রাকৃতিক।
কৃষ্ণকলিদের হাসিতে কখনো কৃত্রিমতা থাকে না। তাইতো খুব সহজে পুরুষহৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে।
কৃষ্ণকলি আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর হয়েছে। কেবল তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে এই কালোমেয়েটির দিকে। নির্নিমেষ। অন্তকাল।

আরও পড়ুন- ক্রসফায়ার গল্প

ফলো করুন- পরিক্রমা